মৌলভীবাজার শহর এক ভয়াবহ সহিংসতার সাক্ষী হলো, যেখানে আন্তঃধর্মীয় একটি বিয়েকে কেন্দ্র করে নেমে আসে রক্তাক্ত তাণ্ডব। গত ১৪ মার্চ ২০২৬, দুপুরের শান্ত পরিবেশ মুহূর্তেই পরিণত হয় চিৎকার, আতঙ্ক আর রক্তে ভেজা বিভীষিকায়। এ ঘটনায় এক মা নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন এবং একাধিক ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়ছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, খ্রিস্টান যুবক মুকুল রয় ও মুসলিম তরুণী বিনা বেগম ভালোবাসার সম্পর্কের সূত্র ধরে সামাজিক বাধা অতিক্রম করে গত ১ ফেব্রুয়ারি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু এই সম্পর্কই পরবর্তীতে সহিংসতার বিস্ফোরণে রূপ নেয়।
অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর বিনা বেগমের পিতা রব্বান মিয়া ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠেন। একদল সশস্ত্র সহযোগী নিয়ে তিনি প্রথমে মুকুল রয়ের বাড়িতে হামলা চালান। সেখানে লক্ষ্যবস্তু না পেয়ে তারা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে এবং হামলার দিক ঘুরিয়ে দেয় তানজিব ইসলামের বাড়ির দিকে—যিনি এই বিয়েতে সহায়তা করেছিলেন।
এরপর শুরু হয় এক নৃশংস আক্রমণ। মোঃ তানজিব ইসলামকে লক্ষ্য করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে একের পর এক আঘাত করা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়া ছেলেকে বাঁচাতে ছুটে আসেন তার মা রাবিয়া বেগম। সন্তানের ওপর নেমে আসা প্রাণঘাতী আঘাত নিজের মাথায় নিয়ে তিনি মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে যান। তার নিথর দেহ পড়ে থাকে রক্তাক্ত মেঝেতে—এক মায়ের চূড়ান্ত আত্মত্যাগের করুণ প্রতীক হয়ে।
এ সময় হামলাকারীরা থেমে থাকেনি। মোঃ তানজিব ইসলামের পিতা মোঃ মইদুল ইসলামকে নির্মমভাবে মারধর করা হয় এবং তার স্ত্রী সুরমিন বেগমকে লক্ষ্য করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। চারদিকে তখন শুধু আর্তনাদ আর বিশৃঙ্খলা।
আরও এক হৃদয়বিদারক ঘটনায়, বিয়েতে সহায়তার অভিযোগে সৌরভ রায় শুভকে ধরে এনে তার শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনে ঝলসে যাওয়া তার দেহ থেকে নির্গত আর্তচিৎকার চারপাশের মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তিনি এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
হামলার সময় ঘরবাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়, যা পুরো এলাকাকে এক প্রকার আতঙ্কিত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এই ঘটনার পেছনে পূর্বের ব্যক্তিগত ক্ষোভ, সামাজিক অসহিষ্ণুতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে এক বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
ঘটনার পর পুরো এলাকা নিস্তব্ধ ও আতঙ্কগ্রস্ত। সংখ্যালঘু ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা চরমে পৌঁছেছে। বিভিন্ন মহল থেকে এই বর্বর হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে এবং দোষীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি উঠেছে।
প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জড়িত প্রধান ব্যক্তিরা আত্মগোপনে রয়েছেন এবং এখনো কোনো মামলা দায়ের হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে, তবে এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ এখনো কাটেনি।
সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার 









